কৌস্তুভ দে সরকারের দীর্ঘ কবিতা--
মা
মা তোমার করুন মুখটাকে দেখে থাকতে চাই
ওই যে
ভাইকে কোলে নিয়ে কুয়াশায় ভেজা ভোরে
গিয়েছো কলপাড়ে, কাঁঠাল তলায়
ওখানে নালার ধারে হাঁসগুলো প্যাকপ্যাক করছিল
তাদের ক্রমে পালংয়ের ক্ষেত থেকে দূরে
ওই সর্ষে ক্ষেতের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া
নদীটির দিকে তাড়িয়ে দিতে দিতে
একঝলক দেখে নিচ্ছিলে
কয়টা ফুল এসেছে
মাচায় ঝুলতে থাকা লাউয়ের ডগায়
তারপর লংকাক্ষেতের ভেতর দিয়ে আসতে গিয়ে
শিশিরভেজা আলের ওপর দিয়ে
একটা হেলেসাপ চলে যেতে দেখে
আঁতকে উঠলে কিছুটা
তোমার কোমর ও আঁচলের দিকে
শাড়ির কিছু কিছু জায়গা ভিজে গেল জলকনায়
এসে উঠোনের দোলনায় ভাইকে বসিয়ে রেখে
কোমর বেঁধে নেমে পড়লে ঝাঁটা হাতে
ঘর বারান্দা উঠোন ঝাড়ু দিতে
আর সে সময় ক্রমে পাতার বেড়ার ফাঁক দিয়ে
সূর্যের আলো এসে ইস্যৎ ছুঁয়ে গেল
তোমার চেহারায় ঘিরে থাকা চুল
বাড়িতে তখনও কেউ সে ভাবে ওঠেনি ঘুম থেকে
তখনও অনেকেই শুয়ে আছে মশারি টাঙ্গিয়ে
ওরা ওঠার আগেই তোমার
বাড়ির আগোছালো সমস্ত কাজ হয়ে গেল
মা তোমার অমন ব্যস্ত মুখটাকে দেখে থাকতে চাই
তারপর রান্নাঘরের দিকে গেলে
ওখানে খড়কুটো পড়ে আছে উনুনের পাশে
কুপিটা মৃদু জ্বলছিল তখনও
তার থেকে সামান্য কেরোসিন ঢেলে
উনুনের খড় কাঠ খড়ি ঘুঁটে জ্বেলে
কুপিটা নিভিয়ে দিলে
ঘরটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে
ভাতের হাঁড়িতে জল দিলে
জল ফুটতে থাকলো ক্রমশঃ
তারপর চাল ধুতে গেলে কলপাড়ে
ওখানেই রান্নাবাড়ি শেষে একরাশ জামা কাপড় নিয়ে
কাঁচতে বসবে দুপুরে
রোদ এসে পড়বে মাথার ওপর তখন
লুকোচুরি খেলবে পাতা আর পাখিদের সাথে
এইবার চা হয়ে গেল
সবার চায়ের কাপ ধুয়ে
একমনে রান্না করতে নেমেছো
ধোঁয়া উঠছে রান্নাঘরের চাল থেকে
দক্ষিণের ওই বেড়ার জানলার ফাঁক দিয়ে
পাশের জামগাছে বসে থাকা শালিকটা
উড়ে গেল তাই
কাকদুটো কা কা করছিল
ওদের তাড়িয়ে দিয়ে
তুমি তখন কর্মব্যস্ততায়
ভুলে গেছ দূরদেশে পাঠরত বড় খোকাটির কথা
মা তোমার সেই ভুলে থাকা মুখ দেখে থাকতে চাই
দুপুরে স্নানের জন্য গেলে পুকুরের পাড়ে
ওইখানে পাড়ে বসে পায়ের গোড়ালি ধুতে ধুতে
পাড়ার মহিলাদের সাথে গল্প করা তোমার স্বভাব
ডুব দিয়ে গা ধুয়ে
ভেজা শাড়ি পরেই দৌড়ে চলে এলে
তারপর
আয়নার সামনে বসার সেই অপূর্ব ভঙ্গিমা
মা তোমার সেই সুন্দরী মুখটাকে দেখে থাকতে চাই
পরনে তাঁতের শাড়ি
কপালে সিঁদুর
ভেজা চুলের গন্ধে আজো গ্রামবাংলাকে কাছে পাই
মা তোমার সেই বাংলার মুখটাকে দেখে থাকতে চাই

জানা-মানা কবি কৌস্তভ দে সরকার। বর্তমান কবিতায় তিনি মা'র প্রতি নিবেদিত প্রাণ। সুন্দর সহজ সাবলীল ভাষায় এ কবিতাটি বড় মনোময় হয়েছে। ধন্যবাদ কবিকে।
উত্তরমুছুন